Saturday, September 26, 2026

সত্যিকারের স্বাধীন মানুষ বলে কি কেউ আছে দুনিয়াতে?

সত্যিকারের স্বাধীন মানুষ বলে কি কেউ আছে দুনিয়াতে? আপনি হয়তো ভাবছেন আপনি স্বাধীন, কিন্তু আসলে প্রতিটা মানুষই কোনো না কোনো কিছুর গোলাম — কেউ নিজের প্রবৃত্তির, কেউ সমাজের চোখের, কেউ অর্থের, কেউবা ক্ষমতার। আল্লাহ কুরআনে জিজ্ঞেস করেন, "তুমি কি তাকে দেখেছ, যে নিজের প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে?" (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৪৩)। তাই প্রশ্নটা আসলে কখনোই এটা না যে আপনি কারো অধীনতা মানবেন কিনা — প্রশ্নটা হলো, কার অধীনতা মানবেন।


আর এখানেই সমস্যা। আল্লাহ ছাড়া বাকি সবকিছুই তো সৃষ্টি — সীমাবদ্ধ, পরিবর্তনশীল, একদিন শেষ হয়ে যাবে এমন কিছু। একজন ক্ষমতাবান মানুষও একদিন মারা যায়, টাকাপয়সাও উবে যেতে পারে রাতারাতি, মানুষের মতামতও পাল্টে যায় বারবার। এমনকি নিজের ইচ্ছাটাও তো ঘণ্টায় ঘণ্টায় বদলায়। তাহলে এসবের উপর নির্ভর করে জীবন গড়া মানে তো নিজের ভিতটাই অস্থির কিছুর উপর রাখা।


লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ — এই কালিমাটা একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন এটা প্রথমে "না" বলে, তারপর "হ্যাঁ" বলে। আগে বলে "কোনো ইলাহ নেই" — মানে কোনো শাসক, কোনো প্রথা, কোনো ভয়, কোনো লোভ আপনার উপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাখার অধিকার রাখে না। তারপর বলে "আল্লাহ ছাড়া" — একমাত্র তাঁরই সেই অধিকার আছে। এই "না" বলাটাই আসলে মুক্তির শুরু।


ইতিহাসে একটা সুন্দর উদাহরণ আছে। সাহাবি রবি ইবনে আমির (রা.) যখন পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন বলেছিলেন, "আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন যাতে যে চায় তাকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে এক আল্লাহর দাসত্বে নিয়ে আসি" (তাবারী)। খেয়াল করুন, এটা কিন্তু স্পষ্ট মুক্তির ভাষা — লক্ষ্যটাই ছিল মানুষকে অন্য মানুষের স্বেচ্ছাচারী শাসন থেকে বের করে আনা।


আর এই তাওহীদের একটা বাস্তব প্রভাবও আছে জীবনে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "স্রষ্টার অবাধ্যতায় কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই, আনুগত্য শুধু ন্যায্য বিষয়ে" (সহীহ বুখারী, ৭২৫৭; সহীহ মুসলিম, ১৮৪০)। এই একটা কথাই একজন মানুষকে অন্যায় ক্ষমতার সামনে মেরুদণ্ড সোজা রেখে দাঁড়ানোর সাহস দেয় — কারণ কোনো মানুষ, কোনো প্রতিষ্ঠান, কোনো ক্ষমতা আপনার বিবেককে আল্লাহর নির্দেশের বিপরীতে বাধ্য করতে পারে না।


আর নিজের প্রবৃত্তির ব্যাপারেও একই কথা। স্বাধীনতা মানে তো যা খুশি তাই করা নয়, কারণ লাগামহীন প্রবৃত্তিও আসলে এক ধরনের দাসত্ব। কুরআনে আছে, "নিশ্চয় নফস মন্দের প্রতি প্ররোচনাকারী, যদি না আমার রব দয়া করেন" (সূরা ইউসুফ, ১২:৫৩)। একটা স্থির, চিরন্তন মানদণ্ডের কাছে নিজের প্রবৃত্তিকে সমর্পণ করলেই বরং মানুষ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আর স্থিরতা পায় — নিজের ক্ষণস্থায়ী ইচ্ছার হাতে জিম্মি হয়ে থাকার বদলে।


সৃষ্টির অধীনতা আপনাকে বেঁধে রাখে ভয়ে, অস্থিরতায়, তোষামোদে। কিন্তু একমাত্র চিরস্থায়ী আর ন্যায্য সত্তার কাছে সমর্পণ করলে বরং আপনি বাকি সব সৃষ্টির ভয় থেকে মুক্তি পান। এটাই ইসলামের দাবি — প্রকৃত স্বাধীনতা আল্লাহর কাছে সমর্পণের মধ্য দিয়েই আসে, সমর্পণ থেকে পালিয়ে নয়।