Sunday, July 19, 2026

জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা: একই মুদ্রার দুই পিঠ

 

জাতীয়তাবাদ ধর্মকে ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। কারণ ধর্ম যদি রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তি হয়, তাহলে জাতীয় পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণেই জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রায়ই হাত ধরাধরি করে চলে। একটি ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দেয়, অন্যটি তার জায়গায় জাতিকে বসায়। দুটোরই লক্ষ্য এক—আনুগত্যের কেন্দ্রে আল্লাহর বদলে অন্য কিছুকে বসানো। কিন্তু একজন মুসলিমের কাছে সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ঈমান, কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নয়। আমাদের কোন পরিচয়টা প্রাধান্য পাবে তা কেবল রাজনীতির প্রশ্ন নয়, আনুগত্য কার হাতে থাকবে সেই প্রশ্ন।

বাংলাদেশে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে কি অমুসলিমরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে যাবে?

 

⭐ ১. ইসলামি রাষ্ট্রে নাগরিকত্বের ভিত্তি: জাতি নয়, আদর্শ ও ন্যায়বিচার
এটি একটি সভ্যতাভিত্তিক, ইসলামি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।
এখানে নাগরিকত্বের মর্যাদা নির্ধারিত হয় মানবিক মর্যাদা ও আইনি সুরক্ষা দিয়ে।
⭐ ২. রাজনৈতিক নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা ≠ নাগরিকত্বে বৈষম্য
সমালোচকরা বলেন: “অমুসলিমরা রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারে না, তাই তারা সমান নয়।” এই যুক্তি ভুল, কারণ:
✔ প্রতিটি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রেই নেতৃত্ব আদর্শের সাথে বাঁধা
কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধান কমিউনিস্ট হতে হয়
ভ্যাটিকানে রাষ্ট্রপ্রধান ক্যাথলিক
ইহুদি ধর্মীয় আদালতে বিচারক ইহুদি
সেক্যুলার পার্টির নেতা সেক্যুলার মূল্যবোধ মানতে বাধ্য
কেউ বলে না:
“ভ্যাটিকান অমুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করে।”
“কমিউনিস্ট রাষ্ট্র পুঁজিবাদীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানায়।”
কারণ নেতৃত্বের শর্ত মানবিক মর্যাদা নয়—আদর্শিক দায়িত্ব।
✔ ইসলামি রাষ্ট্রেও একই নীতি
রাষ্ট্রপ্রধানকে:
ইসলামি আইন বাস্তবায়ন
জুমার খুতবা দেওয়া
ঈদের নামাজ পরিচালনা
ধর্মীয় সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব
শরিয়াহ অনুযায়ী জবাবদিহি
—এসব দায়িত্ব পালন করতে হয়।
একজন অমুসলিমকে এসব ধর্মীয় দায়িত্ব দেওয়া অযৌক্তিক ও অবাস্তব।
👉 এটি বৈষম্য নয়—এটি আদর্শিক সামঞ্জস্য।
⭐ ৩. জিজিয়া: শাস্তি নয়, বরং নাগরিক দায়িত্বের একটি বিকল্প ব্যবস্থা
আরেকটি অভিযোগ: “অমুসলিমরা জিজিয়া দেয়, তাই তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।” এটিও ভুল ধারণা।
✔ মুসলিমরাও বাধ্যতামূলক কর দেয়: জাকাত
অমুসলিমরা জাকাত দেয় না
✔ জিজিয়া = সামরিক দায়িত্বের বিকল্প
ইসলামি আইনে: মুসলিমরা যুদ্ধ করে রাষ্ট্র রক্ষা করে
অমুসলিমরা যুদ্ধে বাধ্য নয় । তাই তারা একটি সামান্য নাগরিক কর দেয়, যার নাম জিজিয়া ।
এটি আধুনিক রাষ্ট্রে: সামরিক সেবা না করলে অতিরিক্ত কর দেওয়ার মতো বা “civilian exemption tax” এর মতো
✔ জিজিয়া অনেক সময় জাকাতের চেয়ে কম ছিল
ইতিহাসে: দরিদ্র, নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ, সন্ন্যাসী—সবাই জিজিয়া থেকে মুক্ত । অনেক অঞ্চলে জিজিয়া জাকাতের চেয়ে কম ছিল
👉 জিজিয়া কোনো অপমান নয়—এটি একটি নাগরিক চুক্তি।
⭐ ৪. ইসলামি রাষ্ট্রে সমতা = মর্যাদা, সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারে সমতা
ইসলামি সমতা মানে: সমান মানবিক মর্যাদা, সমান আইনি সুরক্ষা, সমান বিচার, সমান নাগরিক অধিকার । কিন্তু সমতা মানে একই ধর্মীয় দায়িত্ব নয়। যেমন:
নারী ও পুরুষ সমান—কিন্তু দায়িত্ব ভিন্ন
সৈনিক ও সাধারণ নাগরিক সমান—কিন্তু দায়িত্ব ভিন্ন
মুসলিম ও অমুসলিম সমান—কিন্তু ধর্মীয় দায়িত্ব ভিন্ন
👉 ভিন্ন দায়িত্ব ≠ ভিন্ন মর্যাদা।
⭐ ৫. ইতিহাস প্রমাণ করে: অমুসলিমরা ইসলামি রাষ্ট্রে উন্নতি করেছে
এটি শুধু তত্ত্ব নয়—ইতিহাসের বাস্তবতা।
ইহুদিরা ইউরোপীয় নির্যাতন থেকে পালিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিল
খ্রিস্টানরা প্রশাসনে উচ্চ পদে ছিল । অমুসলিমরা মন্ত্রী, চিকিৎসক, কূটনীতিক, পণ্ডিত—সবই ছিল বহু অমুসলিম অঞ্চল স্বেচ্ছায় মুসলিম শাসন গ্রহণ করেছিল যদি তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হতো—এটি সম্ভব হতো না।
⭐ উপসংহার: অমুসলিমরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়—এই দাবি বাস্তবসম্মত নয়
বাংলাদেশে ইসলাম ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে:
অমুসলিমরা সমান নাগরিক
সমান আইনি সুরক্ষা
সমান মানবিক মর্যাদা
সমান বিচার
সমান সম্পদ অধিকার
সমান ধর্মীয় স্বাধীনতা
তাদের দায়িত্ব ভিন্ন হতে পারে— কিন্তু মর্যাদা কখনোই ভিন্ন নয়।
ইসলামি রাষ্ট্রে মুসলিম ও অমুসলিমের নাগরিক মর্যাদা সমান— দায়িত্ব ভিন্ন। দায়িত্বের ভিন্নতা কখনোই নাগরিকত্বের অসমতা নয়।

ইসলামি রাষ্ট্র মানেই কি ধর্মীয়/মুসলিম জাতীয়তাবাদ?

 আজকের বিশ্বে জাতীয়তাবাদ এমন একটি ধারণা, যা মানুষের পরিচয়, রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই যখন কেউ বলে—

“ ইসলামি রাষ্ট্র মানেই তো মুসলিম জাতীয়তাবাদ!”
—এই আপত্তি প্রথমে শক্তিশালী মনে হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে, ইসলামি রাষ্ট্র এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদ—এই দুটি ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। ইসলামি রাষ্ট্র কখনোই ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ নয়। কারণ জাতীয়তাবাদ দাঁড়ায় জাতি, ভাষা, ভূখণ্ড বা বংশের ওপর— আর ইসলামি রাষ্ট্র দাঁড়ায় ইসলামি আদর্শ ও মূল্যবোধের ওপর।
দুটি ধারণার ভিত্তি, উদ্দেশ্য ও ফলাফল—সবই আলাদা। এই লেখায় আমরা দেখব—
১) জাতীয়তাবাদ কীভাবে কাজ করে
২) ইসলাম ভিত্তিক রাষ্ট্র কীভাবে ভিন্ন
৩) এবং কেন ইসলামি রাষ্ট্রকে “মুসলিম জাতীয়তাবাদ” বলা ভুল ধারণা
জাতীয়তাবাদের মূলেই জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব
------------------------------------------
জাতীয়তাবাদ বলে:
“আমাদের জাতি সেরা।”
“আমাদের ভাষা সেরা।”
“আমাদের ভূমি সেরা।”
ইসলামি রাষ্ট্র বলে:
“কেউ জাতিগতভাবে শ্রেষ্ঠ নয়।”
“শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়া ও নৈতিকতায়।”
জাতীয়তাবাদ মানুষকে বিভক্ত করে
--------------------------------------
জাতীয়তাবাদ তৈরি করে:
“আমরা বনাম ওরা”
মানুষকে ভাগ করে
সংখ্যালঘু তৈরি করে
ইসলামি রাষ্ট্র তৈরি করে:
একটি আদর্শিক সম্প্রদায়—যেখানে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা বা জাতি কোনো দেয়াল তৈরি করে না। এখানে পরিচয়ের ভিত্তি রক্ত বা মাটি নয়, আদর্শ। তাই একজন চীনা মুসলিম, নাইজেরিয়ান মুসলিম আর বাঙালি মুসলিমের মর্যাদা হুবহু সমান—মাঝখানে কোনো "উঁচু-নিচু" নেই। এই সমতা শুধু মুসলিমের জন্য নয়। একজন অমুসলিম নাগরিকও এখানে সমানভাবে সুরক্ষিত, সমানভাবে সম্মানিত, সমানভাবে রাষ্ট্রের অংশ। রাষ্ট্র নাগরিকত্বকে সমান মর্যাদা দেয় আর সবার ওপরে রাখে ন্যায়বিচারকে।
জাতীয়তাবাদ এই জিনিসটাই কখনো দিতে পারে না। কারণ তার ভিত্তিই হলো "আমরা বনাম ওরা"—এক জাতি, এক ভাষা বা এক রক্তকে বড় করে দেখানো। যে ব্যবস্থা জন্মপরিচয়ে মানুষ ভাগ করে, সে কখনো সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমতা দিতে পারে না।
জাতীয়তাবাদ ভূখণ্ডভিত্তিক
-------------------------------------
জাতীয়তাবাদ বলে:
“এই ভূমিই আমাদের মুখ্য পরিচয় বাকি সব গৌণ ”
ইসলাম ভিত্তিক রাষ্ট্র বলে:
“ইসলামি আদর্শ ও মূল্যবোধই আমাদের মুখ্য পরিচয় বাকি সব গৌণ”
জাতীয়তাবাদ শ্রেষ্ঠত্ববোধ তৈরি করে
---------------------------------------
জাতীয়তাবাদ জন্ম দেয়:
বর্ণবাদ
গোত্রবাদ
জাতিগত অহংকার
বৈষম্য
ইসলাম এগুলোকে নিষিদ্ধ করে। ইসলাম ভিত্তিক রাষ্ট্র জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বকে ভেঙে দেয়। এটি সভ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র, জাতিভিত্তিক নয়।
ইসলামি রাষ্ট্র জাতিগত পরিচয় মুছে দেয় না—নিরপেক্ষ করে
----------------------------------------------------------------------
ইসলাম বলে:
তুমি আরব হতে পারো
বাঙালি হতে পারো
তুর্কি হতে পারো
আফ্রিকান হতে পারো
কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তোমার আদর্শিক পরিচয় তোমার জাতিগত পরিচয়ের ওপরে।
জাতীয়তাবাদ বলে:
“জাতি আগে।”
তাহলে কেন মানুষ ভুল করে ইসলাম ভিত্তিক রাষ্ট্রকে ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ ভাবে?
-------------------------------------------------------------------
কারণ তারা জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রের একমাত্র ভিত্তি মনে করে এবং তারা ধরে নেয় ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র মানেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ— এটি অন্ন ধর্মের ক্ষেত্রে সঠিক হতে পারে কিন্তু ইসলামের ক্ষেত্রে সঠিক নয় কারণ ইসলাম প্রচলিত অর্থে শুধু ধর্মই নয়, এটি একটি আদর্শ ও মূল্যবোধ ভিত্তিক পুর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থাও।
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেমন সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ নয়, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র যেমন পুঁজিবাদী জাতীয়তাবাদ নয়, তেমনি ইসলামি রাষ্ট্র মানে মুসলিম জাতীয়তাবাদ নয়। এটি একটি আদর্শিক ও মূল্যবোধভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। তাই ইসলাম ভিত্তিক রাষ্ট্রকে “মুসলিম জাতীয়তাবাদ” বলা শুধু ভুল নয়, এটি ইসলাম ও ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃত রূপকে না বোঝার ফল।

জাতীয়তাবাদ কি কেবলই একটি রাজনৈতিক আদর্শ

 জাতীয়তাবাদ কি কেবলই একটি রাজনৈতিক আদর্শ

--------------------------------------------------------
জাতীয়তাবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক আদর্শই নয়, এটি একটি ধর্মও বটে। ধর্মের মতই এটিও সার্বভৌমত্ব, পবিত্রতা, আনুগত্য এবং প্রয়োজনে এর জন্য আত্মবিসর্জনও দাবি করে। এটি আইনের এবং বৈধ-অবৈধের চূড়ান্ত উৎস হিসেবে নিজেকে আরোপ করে।
জাতীয়তাবাদ ভূমি, ভাষা, বংশ ও জাতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এখানে দেশই সর্বোচ্চ মূল্য—ধর্ম, নৈতিকতা, আদর্শ সবকিছুই দেশের নিচে স্থান পায়। জাতীয় প্রতীক যেমন পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় বীর—এসবকে প্রায় ধর্মীয় পবিত্রতার মতো মর্যাদা দেওয়া হয়।
এই অনুভূতি ধীরে ধীরে একটি ছদ্ম-ধর্মে পরিণত হয়।
ফলাফল?
অন্য জাতিকে ঘৃণা
ইতিহাস বিকৃতি
বীরপূজা
জাতিগত অহংকার
এগুলো জাতীয়তাবাদের স্বাভাবিক উপজাত।

বর্তমান বাংলাদেশে প্রধান সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বটা আসলে কোথায় ?

বাংলাদেশে প্রধান সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বটা মূলত বাঙালি মুসলমান ও রাবীন্দ্রিক মুসলমানদের মধ্যে । রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের প্রতি ব্যক্তিগত ভালোলাগা বা না-লাগার সাথে এই দ্বন্দ্বের  আসলে কোনো সম্পর্ক নাই । রাবীন্দ্রিক মুসলমানরা রবীন্দ্র-সংস্কৃতিকে  বাঙালিত্বের একমাত্র সহিহ মাপকাঠি হিসেবে হাজির করে  এবং তারা বাংলাদেশের গ্রামীণ ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মুসলমানিক  সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিগুলোকে "সাম্প্রদায়িক", "বহিরাগত", "পশ্চাদপদ " বা "কম পরিশীলিত" হিসেবে অপরায়ন করে। 


১৯৭১: ইতিহাসের গোলকধাঁধা এবং কিছু অপ্রিয় সত্য

 আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ানে ১৯৭১ সালকে একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ পবিত্র তীর্থস্থান’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে আমাদের ইতিহাসের শুরু এবং শেষ। কিন্তু একজন নিরপেক্ষ বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে ইতিহাস কখনোই একরৈখিক (Linear) নয়। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও যখন পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বয়ান একে অপরের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখন বুঝতে হবে আমরা ইতিহাসের কোনো সরল সত্য নয়, বরং একটি জটিল গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে আছি। কেন আজও এই আলোচনা প্রাসঙ্গিক? কারণ, যে অমিমাংসিত প্রশ্নগুলো ১৯৭১-এর জন্ম দিয়েছিল, সেগুলো আজও আমাদের তাড়া করে ফিরছে।


বঞ্চনা ছাড়িয়ে যখন ‘অবজ্ঞা’ বড় হয়ে দাঁড়ালো

১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপট কেবল জিডিপির অসম বণ্টন বা অর্থনৈতিক বৈষম্যের গল্প নয়। পশ্চিম পাকিস্তানি এলিটদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের প্রতি যে গভীর ‘সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অবজ্ঞা’ ছিল, সেটিই ছিল বিভাজনের আসল বীজ। কুদরতুল্লাহ সাহাব তাঁর আত্মজীবনী ‘সাহাব নামা’-তে একটি কুৎসিত চিত্র তুলে ধরেছেন। করাচির এক বৈঠকে ঢাকার সরকারি অফিসের জন্য স্যানিটারি সাপ্লাই কেনার প্রস্তাব উঠলে পাকিস্তানি এলিটরা উপহাস করে বলেছিলেন, "বাঙালিরা তো কলাগাছের আড়ালে কাজ সারে, তাদের জন্য কোমড বা ওয়াশবেশিনের কী দরকার?"

এই অবজ্ঞা বাঙালির ধর্মীয় সত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তৎকালীন গভর্নর ফিরোজ খান নূন মন্তব্য করেছিলেন যে, বাঙালিরা হলো ‘অর্ধেক মুসলমান’। তিনি এমনকি বাঙালিদের খতনা বা সুন্নতে খতনা নিয়েও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন। ভৌগোলিক দূরত্ব ছাপিয়ে দুই অংশকে এক রাখার যে ‘ইসলামী সেতুবন্ধন’ থাকার কথা ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানি এলিটদের এই ‘জাহিলিয়াত’ বা অহংবোধ সেই সেতুটি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।

"আমাদের মুসলমানিত্ব কি এখন লুঙ্গি তুলে তোমাদের প্রমাণ করে দেখাব?" — মাওলানা ভাসানী (ফিরোজ খান নূনের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায়)


পর্দার পেছনের কারিগর: সিরাজুল আলম খান ও ‘নিউক্লিয়াস’

ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কেবল একজন নেতার রোমান্টিক আহ্বানে তৈরি হয়নি। ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকেই সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে ‘নিউক্লিয়াস’ নামক একটি গোপন সংগঠন সক্রিয় ছিল। এই তরুণ ছাত্রনেতারা মার্ক্সবাদ, লেলিনবাদ এবং মাওবাদী আদর্শে গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন।

যেই পতাকা, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এবং স্বাধীনতার ইশতেহার আমরা দেখি, তার সবটুকুই ছিল এই রেডিক্যাল ছাত্রশক্তির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ফসল। যখন শেখ মুজিব আলোচনার টেবিলে সমঝোতার পথ খুঁজছিলেন, এই নিউক্লিয়াস তখন রাজপথ নিয়ন্ত্রণ করছিল। ইতিহাসের এক অপ্রিয় সত্য হলো—মুজিব যখন আলোচনার টেবিলে ব্যস্ত, তখন এই উগ্র জাতীয়তাবাদী ছাত্রশক্তিই জনতাকে চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।


প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন বনাম স্বাধীনতা: একজন বাস্তববাদী মুজিব

শেখ মুজিবুর রহমানকে কেবল একজন ভাবাবেগী নেতা হিসেবে দেখা ইতিহাসবিস্মৃতি। তিনি ছিলেন একজন প্রখর বাস্তববাদী বা ‘ম্যাকাভেলিয়ান’ নেতা। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের অবমুক্ত হওয়া নথিতে আর্চার ব্লাডের রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৭১-এর জানুয়ারিতে ইয়াহিয়া ও মুজিবের মধ্যে একটি গোপন সমঝোতা হয়েছিল—যেখানে মুজিব প্রধানমন্ত্রী এবং ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট থাকার কথা ছিল।

এমনকি ৭ই মার্চের সেই মহাকাব্যিক ভাষণের শেষেও তিনি ‘জয় পাকিস্তান’ (বা জিয়ে পাকিস্তান) বলেছিলেন, যার সাক্ষী এ কে খন্দকার এবং অলি আহাদের মতো ব্যক্তিত্বরা। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং একজন বাস্তববাদী নেতার কৌশল ছিল—যিনি নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরকে অগ্রাধিকার দিচ্ছিলেন। ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের ভাষায় তিনি ছিলেন একজন ‘অনিচ্ছুক লিবারেটর’, যাকে পরিস্থিতির চাপে পড়ে এবং ভাগ্যচক্রে একটি স্বাধীন দেশের হাল ধরতে হয়েছিল।

"১৯৭০ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান ছিল ১৯৪৬ সালের জিন্নাহর মতো—পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অবিসংবাদিত নেতা।" — ডক্টর মাহমুদুর রহমান (দ্যা পলিটিক্যাল হিস্ট্রি অফ মুসলিম বেঙ্গল)


ভুট্টো: অখণ্ড পাকিস্তানের আসল ঘাতক

পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পেছনে যদি একক কোনো অপরাধী চিহ্নিত করতে হয়, তবে তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টো। ইয়াহিয়া খানের হলফনামা এবং ঐতিহাসিক দলিলগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, ভুট্টোর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহাই ভারতকে হস্তক্ষেপের চূড়ান্ত সুযোগ করে দিয়েছিল।

ভুট্টো কোনোভাবেই একজন বাঙালির অধীনে কাজ করতে রাজি ছিলেন না। তাঁর ইগো এবং রাজনৈতিক জেদই পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সশস্ত্র যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ৭১-এর যুদ্ধ কেবল বাইরের ষড়যন্ত্র ছিল না, বরং এটি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ শাসকশ্রেণির ক্ষমতার লালসার অনিবার্য পরিণতি।


আদর্শিক ব্যর্থতা এবং একটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প

পাকিস্তান ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ হিসেবে ব্যর্থ হয়েছে কারণ এটি ছিল একটি ধর্মহীন এলিট শ্রেণির তৈরি ‘ইসলামী মুখোশধারী’ সেকুলার প্রজেক্ট। অন্যদিকে, এর প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের ‘ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ’ মূলত ভারতীয় আধিপত্যের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

আমরা কি আসলেই মুক্তি পেয়েছি? ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাস হলো, ১৯৭১-এর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে কায়দায় উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ বা বালুচিস্তানে দমন-পীড়ন চালিয়েছিল, বর্তমান বাংলাদেশেও গুম, খুন এবং ‘আয়না ঘর’-এর সংস্কৃতি সেই একই নিপীড়ক চরিত্রের প্রতিফলন ঘটায়। লেখকের ভাষায়, "আমরা ইসলামের ‘রুহ’ বা আত্মা হারিয়েছি এবং তা প্রতিস্থাপন করেছি মানুষের তৈরি ত্রুটিপূর্ণ ‘তন্ত্র-মন্ত্র’ দিয়ে।" আমরা তথাকথিত প্র্যাগমাটিজমের দোহাই দিয়ে স্বল্পমেয়াদী লাভ খুঁজছি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমরা এক ভয়াবহ ‘দুষ্টচক্রে’ বন্দি হয়ে পড়েছি।


উপসংহার: আমাদের গন্তব্য কোথায়?

১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের দেখায় যে, রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র না বদলালে কেবল মানচিত্র বদলিয়ে প্রকৃত মুক্তি আসে না। তৎকালীন পাকিস্তানি এলিটদের অবজ্ঞা আর বর্তমানের শাসনব্যবস্থার নিপীড়ন—দুটির উৎসই মূলত এক। আমরা ‘সিরাত-আল-মুস্তাকিম’ বা ইনসাফের সরল পথ ছেড়ে দিয়ে রাজনৈতিক চাতুর্যের গোলকধাঁধায় ঘুরছি।

আজ ৫৩ বছর পর আমাদের নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করা প্রয়োজন: আমরা কি কেবল একটি ভূখণ্ডগত স্বাধীনতা চেয়েছিলাম, নাকি একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ? যদি লক্ষ্য হয় ইনসাফ, তবে আমরা কি আজও সেই একই শোষক শ্রেণির হাতে বন্দি নই? আমরা কি কেবল শৃঙ্খল পরিবর্তন করছি, নাকি আসলেই মুক্ত হতে পেরেছি? যতক্ষণ না আমরা মানুষের তৈরি ত্রুটিপূর্ণ তন্ত্রের ঊর্ধ্বে উঠে একটি শাশ্বত ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে ফিরে আসছি, ততক্ষণ এই গোলকধাঁধা থেকে আমাদের মুক্তি নেই।


( আসিফ আদনানের দেয়া একটি লেকচারের এ আই সারমর্ম )


ইনশা আল্লাহ ইসলামের বিজয় আসবেই যদি আমরা ......

 ব্যাক্তিগত পর্যায়ে ছাত্র-জনতা ওয়াহানকে (দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা) পরাজিত করতে পেরেছিল, তাই আল্লাহর অসীম রহমতে ৫ই আগস্টে আমরা মাফিয়া সর্দারনী হাসিনাকে উৎখাত করতে পেরেছি । ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় আসবেই যদি আমরা আমাদের ওয়াহানকে  ইসলামের জন্য পরাজিত করতে পারি ইনশা আল্লাহ ।

আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শীঘ্রই মানুষ তোমাদেরকে আক্রমন করার জন্য আহবান করতে থাকবে, যেভাবে মানুষ তাদের সাথে খাবার খাওয়ার জন্য একে-অন্যকে আহবান করে।’

জিজ্ঞেস করা  হলো, ‘তখন কি আমরা সংখ্যায় কম হবো?’ তিনি বললেন, ‘না, বরং তোমরা সংখ্যায় হবে অগণিত কিন্তু তোমরা সমুদ্রের ফেনার মতো হবে, যাকে সহজেই সামুদ্রিক স্রোত বয়ে নিয়ে যায় এবং আল্লাহ তোমাদের শত্রুর অন্তর থেকে তোমাদের ভয় দূর করে দিবেন এবং তোমাদের অন্তরে আল-ওয়াহ্হান ঢুকিয়ে দিবেন।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.),আল– ওয়াহ্হান কি?’ তিনি বললেন, ‘দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা।’ (মুসনাদে আহমদ)