Monday, May 18, 2026

১৯৭১: ইতিহাসের গোলকধাঁধা এবং কিছু অপ্রিয় সত্য



১৯৭১: ইতিহাসের গোলকধাঁধা এবং কিছু অপ্রিয় সত্য
আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ানে ১৯৭১ সালকে একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ পবিত্র তীর্থস্থান’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে আমাদের ইতিহাসের শুরু এবং শেষ। কিন্তু একজন নিরপেক্ষ বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে ইতিহাস কখনোই একরৈখিক (Linear) নয়। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও যখন পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বয়ান একে অপরের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখন বুঝতে হবে আমরা ইতিহাসের কোনো সরল সত্য নয়, বরং একটি জটিল গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে আছি। কেন আজও এই আলোচনা প্রাসঙ্গিক? কারণ, যে অমিমাংসিত প্রশ্নগুলো ১৯৭১-এর জন্ম দিয়েছিল, সেগুলো আজও আমাদের তাড়া করে ফিরছে।

বঞ্চনা ছাড়িয়ে যখন ‘অবজ্ঞা’ বড় হয়ে দাঁড়ালো
১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপট কেবল জিডিপির অসম বণ্টন বা অর্থনৈতিক বৈষম্যের গল্প নয়। পশ্চিম পাকিস্তানি এলিটদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের প্রতি যে গভীর ‘সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অবজ্ঞা’ ছিল, সেটিই ছিল বিভাজনের আসল বীজ। কুদরতুল্লাহ সাহাব তাঁর আত্মজীবনী ‘সাহাব নামা’-তে একটি কুৎসিত চিত্র তুলে ধরেছেন। করাচির এক বৈঠকে ঢাকার সরকারি অফিসের জন্য স্যানিটারি সাপ্লাই কেনার প্রস্তাব উঠলে পাকিস্তানি এলিটরা উপহাস করে বলেছিলেন, "বাঙালিরা তো কলাগাছের আড়ালে কাজ সারে, তাদের জন্য কোমড বা ওয়াশবেশিনের কী দরকার?"
এই অবজ্ঞা বাঙালির ধর্মীয় সত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তৎকালীন গভর্নর ফিরোজ খান নূন মন্তব্য করেছিলেন যে, বাঙালিরা হলো ‘অর্ধেক মুসলমান’। তিনি এমনকি বাঙালিদের খতনা বা সুন্নতে খতনা নিয়েও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন। ভৌগোলিক দূরত্ব ছাপিয়ে দুই অংশকে এক রাখার যে ‘ইসলামী সেতুবন্ধন’ থাকার কথা ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানি এলিটদের এই ‘জাহিলিয়াত’ বা অহংবোধ সেই সেতুটি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।
"আমাদের মুসলমানিত্ব কি এখন লুঙ্গি তুলে তোমাদের প্রমাণ করে দেখাব?" — মাওলানা ভাসানী (ফিরোজ খান নূনের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায়)

পর্দার পেছনের কারিগর: সিরাজুল আলম খান ও ‘নিউক্লিয়াস’
ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কেবল একজন নেতার রোমান্টিক আহ্বানে তৈরি হয়নি। ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকেই সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে ‘নিউক্লিয়াস’ নামক একটি গোপন সংগঠন সক্রিয় ছিল। এই তরুণ ছাত্রনেতারা মার্ক্সবাদ, লেলিনবাদ এবং মাওবাদী আদর্শে গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন।
যেই পতাকা, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এবং স্বাধীনতার ইশতেহার আমরা দেখি, তার সবটুকুই ছিল এই রেডিক্যাল ছাত্রশক্তির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ফসল। যখন শেখ মুজিব আলোচনার টেবিলে সমঝোতার পথ খুঁজছিলেন, এই নিউক্লিয়াস তখন রাজপথ নিয়ন্ত্রণ করছিল। ইতিহাসের এক অপ্রিয় সত্য হলো—মুজিব যখন আলোচনার টেবিলে ব্যস্ত, তখন এই উগ্র জাতীয়তাবাদী ছাত্রশক্তিই জনতাকে চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন বনাম স্বাধীনতা: একজন বাস্তববাদী মুজিব
শেখ মুজিবুর রহমানকে কেবল একজন ভাবাবেগী নেতা হিসেবে দেখা ইতিহাসবিস্মৃতি। তিনি ছিলেন একজন প্রখর বাস্তববাদী বা ‘ম্যাকাভেলিয়ান’ নেতা। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের অবমুক্ত হওয়া নথিতে আর্চার ব্লাডের রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৭১-এর জানুয়ারিতে ইয়াহিয়া ও মুজিবের মধ্যে একটি গোপন সমঝোতা হয়েছিল—যেখানে মুজিব প্রধানমন্ত্রী এবং ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট থাকার কথা ছিল।
এমনকি ৭ই মার্চের সেই মহাকাব্যিক ভাষণের শেষেও তিনি ‘জয় পাকিস্তান’ (বা জিয়ে পাকিস্তান) বলেছিলেন, যার সাক্ষী এ কে খন্দকার এবং অলি আহাদের মতো ব্যক্তিত্বরা। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং একজন বাস্তববাদী নেতার কৌশল ছিল—যিনি নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরকে অগ্রাধিকার দিচ্ছিলেন। ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের ভাষায় তিনি ছিলেন একজন ‘অনিচ্ছুক লিবারেটর’, যাকে পরিস্থিতির চাপে পড়ে এবং ভাগ্যচক্রে একটি স্বাধীন দেশের হাল ধরতে হয়েছিল।
"১৯৭০ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান ছিল ১৯৪৬ সালের জিন্নাহর মতো—পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অবিসংবাদিত নেতা।" — ডক্টর মাহমুদুর রহমান (দ্যা পলিটিক্যাল হিস্ট্রি অফ মুসলিম বেঙ্গল)

ভুট্টো: অখণ্ড পাকিস্তানের আসল ঘাতক
পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পেছনে যদি একক কোনো অপরাধী চিহ্নিত করতে হয়, তবে তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টো। ইয়াহিয়া খানের হলফনামা এবং ঐতিহাসিক দলিলগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, ভুট্টোর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহাই ভারতকে হস্তক্ষেপের চূড়ান্ত সুযোগ করে দিয়েছিল।
ভুট্টো কোনোভাবেই একজন বাঙালির অধীনে কাজ করতে রাজি ছিলেন না। তাঁর ইগো এবং রাজনৈতিক জেদই পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সশস্ত্র যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ৭১-এর যুদ্ধ কেবল বাইরের ষড়যন্ত্র ছিল না, বরং এটি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ শাসকশ্রেণির ক্ষমতার লালসার অনিবার্য পরিণতি।

আদর্শিক ব্যর্থতা এবং একটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প
পাকিস্তান ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ হিসেবে ব্যর্থ হয়েছে কারণ এটি ছিল একটি ধর্মহীন এলিট শ্রেণির তৈরি ‘ইসলামী মুখোশধারী’ সেকুলার প্রজেক্ট। অন্যদিকে, এর প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের ‘ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ’ মূলত ভারতীয় আধিপত্যের একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
আমরা কি আসলেই মুক্তি পেয়েছি? ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাস হলো, ১৯৭১-এর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে কায়দায় উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ বা বালুচিস্তানে দমন-পীড়ন চালিয়েছিল, বর্তমান বাংলাদেশেও গুম, খুন এবং ‘আয়না ঘর’-এর সংস্কৃতি সেই একই নিপীড়ক চরিত্রের প্রতিফলন ঘটায়। লেখকের ভাষায়, "আমরা ইসলামের ‘রুহ’ বা আত্মা হারিয়েছি এবং তা প্রতিস্থাপন করেছি মানুষের তৈরি ত্রুটিপূর্ণ ‘তন্ত্র-মন্ত্র’ দিয়ে।" আমরা তথাকথিত প্র্যাগমাটিজমের দোহাই দিয়ে স্বল্পমেয়াদী লাভ খুঁজছি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমরা এক ভয়াবহ ‘দুষ্টচক্রে’ বন্দি হয়ে পড়েছি।

উপসংহার: আমাদের গন্তব্য কোথায়?
১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের দেখায় যে, রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র না বদলালে কেবল মানচিত্র বদলিয়ে প্রকৃত মুক্তি আসে না। তৎকালীন পাকিস্তানি এলিটদের অবজ্ঞা আর বর্তমানের শাসনব্যবস্থার নিপীড়ন—দুটির উৎসই মূলত এক। আমরা ‘সিরাত-আল-মুস্তাকিম’ বা ইনসাফের সরল পথ ছেড়ে দিয়ে রাজনৈতিক চাতুর্যের গোলকধাঁধায় ঘুরছি।
আজ ৫৩ বছর পর আমাদের নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করা প্রয়োজন: আমরা কি কেবল একটি ভূখণ্ডগত স্বাধীনতা চেয়েছিলাম, নাকি একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ? যদি লক্ষ্য হয় ইনসাফ, তবে আমরা কি আজও সেই একই শোষক শ্রেণির হাতে বন্দি নই? আমরা কি কেবল শৃঙ্খল পরিবর্তন করছি, নাকি আসলেই মুক্ত হতে পেরেছি? যতক্ষণ না আমরা মানুষের তৈরি ত্রুটিপূর্ণ তন্ত্রের ঊর্ধ্বে উঠে একটি শাশ্বত ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে ফিরে আসছি, ততক্ষণ এই গোলকধাঁধা থেকে আমাদের মুক্তি নেই।

( আসিফ আদনানের দেয়া একটি লেকচারের এ আই সারমর্ম )

No comments:

Post a Comment